ঢাবিসাদ- পোড়া সোনার মত পরিশুদ্ধও করে আমাদের

Wed, Apr 17, 2019 10:41 PM

ঢাবিসাদ- পোড়া সোনার মত পরিশুদ্ধও করে আমাদের

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

সুজিত মোস্তফা : আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞাণ বিভাগের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু ক্লাসের চেয়ে আমার বিচরণ অনেক বেশি ছিল টিএসসির আঙ্গিনায়। ছায়ানট ছিল আমার গান শেখার স্কুল আর নিজের গানের ভান্ড উজার করে দেবার জায়গা ছিল টিএসসি।

যেই সময়ের কথা বলছি তখন জামান স্যার ছিলেন টিএসসির প্রধান। তিনি আকন্ঠ সংগীত পিয়াসী ছিলেন। আমাকে গান গাইবার জন্য তিনি টিএসসির দোতলায় তবলা হারমোনিয়ম সহ একটা ঘর বরাদ্দ করেছিলেন। এই ঘরের ঠিক বিপরীতের ঘরটা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংষ্কৃতিক দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর। পাশের বড় রুমটাই ছিল মহড়া কক্ষ। আমার গানের ঘরে সকাল থেকেই আগমন ঘটতো সংগীত পিয়াসী ভক্ত ছাত্র ছাত্রীদের। এবং বলতে দ্বিধা নেই ছাত্রীভক্ত সবসময়ই ছিল ৪ গুনেরও বেশি। এই মুহূর্তে বিবিসিতে কর্মরত জার্নালিজমের পুলক গুপ্ত আমার সুরবন্ধু ছিল। লাকী ভাইয়ের সাংষ্কৃতিক দলের কর্মকান্ডকে আমি এবং পুলক খুব একটা আমলে নেই নাই। সেটা একটা গান বাজনার দল হিসেবেই আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়েছিল। কিন্তু লাকী ভাইয়ের ভাবনার সুদূরপ্রসারীতা ছিল। অপ সংষ্কৃতির দাবানল তখন বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্রাস করেছিল। একটা সাংষ্কৃতিক দল করবো আর সেই দলের কর্মপ্রক্রিয়ায় একটা তরুণ প্রজন্মকে পাল্টে দেবো এটা একজন তরুণ নেতার জন্য বিশাল একটা ভাবনা। এই ভাবনায় আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে লাকী ভাইয়ের সময় লাগেনি কারণ তিনি নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলেও এমনই সহজ বন্ধুত্বের এক সূতোয় আমাদের বাঁধলেন যে আমাদেরই একজন হয়ে গেলেন।

 

 গানের শিল্পীদের চাহিদা বেশি অতএব খানিকটা দাম্ভিকতাও তাদের মধ্যে চলে আসে। আমি খানিকটা নিজেকে আলাদাই ভেবেছিলাম। সুযোগ হলেই বন্ধুরা গান শুনতে চাইছে, আমিও হারমোনিয়ম নিয়ে বসে যাচ্ছি, এ কারণে একটা আলাদা গুরুত্ব পেতাম বা বোধ করতাম। কারণ আবৃত্তি, নাটক বা নাচের শিল্পীদের এরকম অনুরোধ কেউ সেরকম করতো না। এই আলাদা গুরুত্বের জায়গা থেকে নিজেকে মাটিতে নামিয়ে আনতে ঢাবিসাদ এক দারুণ ভূমিকা পালন করলো। বিভিন্ন এলাকার, বিভিন্ন উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের, বিভিন্ন বিভাগের কত কত ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়েরা তাদের সাংষ্কৃতিক আগ্রহ এবং নৈপূণ্য প্রকাশের জন্য এক বিনি সূতোর মালায় গাঁথা পরেছে, যেই মালার আমিও একটা অংশ ভাবতেই এক নিদারুণ আনন্দদোলায় দুলতাম। নিজ বিভাগের বন্ধুর বাইরে এ কারণেই এত ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের গুণী বন্ধুদের সান্নিধ্য লাভ করলাম। এই সমস্ত বন্ধুত্ব এখনো অটুট আছে।

 আমি ১৯৮৬ তে ভারতে চলে যাই গান শিখতে। পরবর্তী বিকাশকালটায় আমি ঢাবিসাদের সঙ্গে সেভাবে ছিলাম না। কিন্তু দল আরো কত ভারী হয়েছে, আরো কত নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করেছে সে খবর রাখতাম। এই দল আমার অনেক কষ্টের মুহূর্তকে ভুলিয়ে নতুন প্রেরণায় উজ্জিবীত করেছে কতবার। টিএসসি মিলনায়তনে তখন রুচিশীল গান গাওয়া ছিল দুঃসাধ্য একটা কাজ। একটা নজরুলের গান বা বেসিক বাংলা গান গাইতে গেলে স্টেজে নিক্ষেপ করা হতো ওয়েষ্ট প্রোডাক্ট। এগ্রেসিভ অনেক শ্রোতা মাস্তানী দেখাতে স্টেজে উঠে শিল্পীকে হেনস্তা করতো। ঢাবিসাদ এই লাগামহীন নতুন প্রজন্ম'র রুচি পরিবর্তনে কঠিন এবং কৌশলী ভূমিকা নিয়েছিল। যে দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয়ার কথা সেটি মাথায় তুলে নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক'জন তরুণ ছাত্রছাত্রী।

 অনেক পরিকল্পনা ছিল রীতিমত দুঃসাহসী। 'মহুয়া' নৃত্যনাট্য বা পথনাটক 'অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ' নিয়মিত আয়োজন করা কোনো মুখের কথা নয়। কোনো অর্থনৈতিক প্রাপ্তি নেই, বেতার টিভির কভারেজ নেই, কোনো পদক বা পুরষ্কার নেই বরং বিরুদ্ধ স্বৈরাচারী শক্তির চোখরাঙানী, সন্ত্রাসী শক্তির হুমকী এগুলো অবলীলায় অগ্রাহ্য করে কি এক অলৌকিক শক্তিতে বলীয়ান ছিল ঢাবিসাদ আজ সেটা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। অসংখ্য নিয়মিত এবং অনিয়মিত সাংষ্কৃতিক আয়োজন এক স্বপ্নময়তার মধ্যে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। ঢাবিসাদ অসংখ্য কর্মীর মননের ভিত প্রস্তুত করেছিল। সেই স্বপ্নের ঘোর কি আজও কেটেছে? কাটেনি। আজও কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যহত আছে। অনেক অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব যেন এখনো আমাদের কাঁধে। কে জানে আবার কোনোদিন হয়তো আমরা সবাই একসাথে মিলে পূর্ণদ্যমে জাতির সাংষ্কৃতিক মনন ঋদ্ধ করতে আবার ঝাঁপ দেবো একসাথে। এই ভাবনাটা আমার কাছে অবাস্তব মনে হয় না। কারণ সাংষ্কৃতিক দলের প্রতিটি কর্মীর সদাহাস্য সাংষ্কৃতিক অবয়বটির ভিতরে রয়েছে উত্তপ্ত আগুন, যে আগুন শুধু অনাচার ঝলসে দেয় না, পোড়া সোনার মত পরিশুদ্ধও করে আমাদের।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান