রাজনীতিবিদরা কি হারিয়ে যাবেন

Thu, Dec 13, 2018 10:03 PM

রাজনীতিবিদরা কি হারিয়ে যাবেন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : পরিসংখ্যান অনেক সময় নির্মম, যেমন পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের, অথবা মাদকাসক্তি বৃদ্ধির। কিছু পরিসংখ্যান আমাদের সতর্ক করে, কিছু পরিসংখ্যান তদন্ত করতে, প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ রকম একটি পরিসংখ্যান আমরা সম্প্রতি পত্রিকায় দেখেছি, এবং এটি আমাদের জাতীয় সংসদের সদস্যদের পেশা ও শ্রেণিসম্পর্কিত। দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৩ সাল থেকে নিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। 'আশঙ্কাজনক' কথাটা পরিসংখ্যান প্রস্তুতকারীরা ব্যবহার করেননি, করেছেন মিডিয়া কর্মীরা। এবং আমরা যারা বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে ভাবি, আমাদের চিন্তাতেও তা সমর্থন পায়।

 

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে  বিজয়ীদের মধ্যে রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি ছিল প্রবল, আশি শতাংশেরও বেশি। ২০১৪ সালে তা নেমে আসে কুড়ি শতাংশেরও নিচে। গত কয়েকটি সংসদে সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্ব ব্যবসায়ীদের। তারা আছেন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের ঘরে। এই মাসের শেষে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে তাদের সংখ্যা আরও বাড়বে। এখন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকে ব্যবসায়ী শ্রেণিতে নাম লিখিয়েছেন। কাগজে দেখলাম, নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীরা যেসব হলফনামা দিয়েছেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন, তা দেখে অবশ্য মনে হতে পারে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীই বেশ দরিদ্র- দু-একজন ব্যবসায়ী তাদের মালিকানায় থাকা আসবাবপত্রের যে মূল্য দিয়েছেন, তার থেকে বেশি মূল্যে আসবাবপত্র আমার বাড়িতেই আছে, অথচ আমি একজন বেতনভোগী শিক্ষক। হলফনামায় কেউ অবশ্য সত্যি কথাটা লেখেন না। বেশিরভাগকে দেখা গেল স্ত্রীর দয়া-দাক্ষিণ্যে চলেন। থাকেন স্ত্রীর কেনা ফ্ল্যাটে।

 

সে যাই হোক, মূল বিষয়টা থেকে দূরে না গিয়েও বলা যায়, এই তথ্য গোপনের প্রবণতা শুরু হয়েছে যেদিন থেকে তৃণমূলের রাজনীতিবিদরা পেছনে পড়ে যেতে শুরু করেছেন। আয়কর বিভাগে দীর্ঘদিন চাকরি করা আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল, দেশের সব ব্যবসায়ী যদি কর দিতেন এবং আয় অনুযায়ী কর দিতেন, তাহলে দুটি পদ্মা সেতু বানাবার পয়সা আমরা প্রতিবছর পেতাম। বলে নেওয়া ভালো, পেশা হিসেবে ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে আমার বলার কিছুই নেই; ব্যবসায়ীদেরও আমি সম্মান করি, দেশ গঠনে তাদের অবদানের প্রশংসা করি, কিন্তু ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন, সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই। এই সমস্যার একটা মোটামুটি ছবি আমরা দু-তিনটি উদাহরণ থেকে পেতে পারি।

 

যেমন, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমরা যেসব কথা কখনও শুনিনি, সেগুলোর মধ্যে ছিল ভোট কেনাবেচা, মনোনয়ন বাণিজ্য, পার্টিতে চাঁদা দেওয়া, নির্ধারিত নির্বাচনী ব্যয়ের কয়েকগুণ খরচ করা, মোটরসাইকেল শো-ডাউন ও নির্বাচনী পার্টি দেওয়া, টাকার খেলা ইত্যাদি। এখন এসব কথা রাত-দিন আমাদের শুনতে হয়। এ কথা স্বীকার করতে কারও দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, এখন গোটা নির্বাচনটাই একটা বাণিজ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে তো কয়েক কোটি টাকা ছাড়া নির্বাচন করাটা কঠিন হয়ে গেছে, তার ওপর অনেকে দশ-বিশ কোটি টাকা দিয়েও নির্বাচনী টিকিট কিনছেন। ফলে ক্ষতিটা হচ্ছে কয়েক রকমের : যেমন, রাজনীতিতে আদর্শের জায়গাটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটছে, যেনতেন প্রকারে নির্বাচনে জেতার মানসিকতা থেকে সহিংসতার জন্ম হচ্ছে, দুর্নীতির বিস্তার বাড়ছে এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে।

 

আগেই বলেছি, এখনও বলছি, রাজনীতিতে ও সংসদে অনেক ব্যবসায়ী আছেন, আগামীতেও থাকবেন- যারা নীতি-নৈতিকতা মেনে চলেন, মানুষের পক্ষে থাকেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা কম, আশাব্যঞ্জক হওয়ার মতো নয়। ওপরে যে সমস্যাগুলোর কথা লিখেছি, সেগুলো তৈরি হয়েছে নির্বাচনে 'টাকার খেলা' শুরু হলে, যেগুলো শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। তরুণরা এখন রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করে না, কারণ তারা সুস্থ রাজনীতি করেন না। কিন্তু যে দেশে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসায়ীরা, রাজনীতি কীভাবে সুস্থ হবে?

 

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা, এমনকি বিচারপতিরা যখন নির্বাচনে নামেন তখন প্রকৃত রাজনীতিবিদরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কারণ যারা তৃণমূলে রাজনীতি করেন তারা মানুষের সঙ্গে থাকেন, তাদের সুখ-দুঃখে অংশী হন, তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে চেষ্টা করেন। অবসরপ্রাপ্তরা এসব মানুষ থেকে দূরেই থাকেন, এবং তাদের সামাজিক অবস্থান তাদের তৃণমূলে অংশগ্রহণকে কঠিন করে তোলে। অবসরপ্রাপ্তরা চেষ্টা করলেও তৃণমূলে অবস্থা পরিবর্তনে বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না।

 

আমরা দাবি করি বটে যে, আমাদের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন দরকার, কিন্তু সেটি খুব সহজে করা সম্ভব নয়। যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, যদি সংসদে রাজনীতিবিদরা ক্রমাগত সংখ্যালঘিষ্ঠ হতে থাকেন, তাহলে গুণগত পরিবর্তন দূরের কথা, রাজনীতিতে 'টাকার খেলা'টা চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। এবারের নির্বাচনে যেভাবে এককালের অনেক নৌকা-প্রতীকধারী ধানের শীষ হাতে নির্বাচনে নেমেছেন (এবং কয়েক ক্ষেত্রে উল্টোটিও ঘটেছে) তা দেখে আমার এক ছাত্র বলেছিল, নির্বাচন কি স্যার বাণিজ্য হয়ে গেল? কোনো আদর্শের এখানে জায়গা নেই?

 

তাকে কোনো উত্তর দিতে পারিনি। আগামীতে পারব কি-না, তা-ও ভাবতে পারছি না।

সূত্র: সমকাল


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান