পাঠশালার আসরে স্টিফেন হকিং এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

Sun, Apr 22, 2018 1:01 AM

পাঠশালার  আসরে স্টিফেন হকিং এর  প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

নতুনদেশ ডটকম: গত ১৯ এপ্রিল "পাঠশালা"র ৫ম আসর, এগলিনটন স্কয়ার টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরীতে অনুষ্ঠিত হয়। সদ্য প্রয়াত স্টিফেন হকিং এর কর্ম ও জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই আসরটি নিবেদন করা হয়। আসরে স্টিফেন হকিং রচিত  ‘অ্যা ব্রিফ হিষ্ট্রি  অব টাইম’ বইটির ওপর আলোচনা করেন বিজ্ঞান লেখক স্বপন বিশ্বাস।

স্লাইড-এর মাধ্যমে উপস্থাপিত এ আলোচনায় স্বপন বিশ্বাস বলেন, স্টিফেন হকিংকে ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। অগণিত সৌরমন্ডল, গ্রহ-উপগ্রহ, গ্যালাক্সি, নেবুলা, ব্ল্যাক হোল, পালসার, কোয়াসার, নিউট্রন ষ্টার, ধুমকেতু ও কৃষ্ণবস্তু নিয়ে বিপুলায়তন মহাবিশ্ব। পৃথিবী স্থির আর গ্রহ ও সূর্য তার চারপাশে ঘুরছে - এই ধারণা নিয়ে গড়ে ওঠে ভূকেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদ। অ্যারিস্টট্ল আর টলেমী এ মতের প্রবক্তা। টলেমীর ভূকেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদ ১০০০ বছর ব্যাপী চালু ছিল। ১৫১৪ সালে কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী নয়, সূর্য স্থির আর আমরা তার চারপাশে ঘুরছি। এর প্রায় ১০০ বছর পরে কেপলার ও গ্যালিলিও কোপার্নিকাসের মডেলকে সমর্থন করেন। ১৬৮৭ সালে নিউটনের Principia Mathematica প্রকাশিত হয় যেখানে গতির সূত্র ও অভিকর্ষ সূত্রের প্রথম প্রকাশ ঘটে। ১৯২৯ সালে হাবল-এর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কার হয় যে, গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে।

আসরের বক্তা স্থান ও কালের নিউটনীয় ও আইনস্টাইনের ধারণা ব্যক্ত করেন। তিনি বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সিদ্ধান্তসমূহ তুলে ধরেন ও কি করে স্থান ও কালের ধারণা বদলে গেল এবং স্থান-কালের বক্রতার ধারণা সামনে এসে নিউটনীয় সূত্রের অপ্রাসঙ্গিকতা মূর্ত হয়ে উঠলো সেটি ব্যাখ্যা করেন।তারপর তিনি সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের ধারনাটি ব্যাখ্যা করেন।

আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও তার অগ্রগতি কথা বলেন। তিনি নেবুলা থেকে তারার জন্ম ও পরিবর্তনের চিত্রটি তুলে ধরে ব্ল্যাক হোলে এসে পৌঁছান। এ পর্যায়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন চন্দ্রশেখর সীমা ও বড় তারাদের সাদা বামন, নিউট্রন ষ্টার ও ব্ল্যাক হোল সৃষ্টির পর্যায়ক্রম। আলোচনাটি শেষ হয় ব্ল্যাক হোলের  বিকিরণ ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে, যে বিকিরণের নাম হকিং বিকিরণ।

অ্যা ব্রিফ হিষ্ট্রি অব টাইম  বা ‘সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ বইটিতে  স্টিফেন হকিং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। কি করে শুরু হল এই বিশ্ব? এর গঠন কি রকম? এর শেষ কোথায়? বিশ্ব কি সসীম না অসীম? এগুলো হচ্ছে বৃহত্তর মানব সমাজের চিরন্তন জিজ্ঞাসা। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে স্টিফেন হকিং বৈজ্ঞানিক নয় এমন জনগোষ্ঠীর কাছে হাজির হয়েছেন উত্তরমালার ঝাঁপি নিয়ে। সরল বর্ণনা, হৃদয়গ্রাহী উপমা আর যুতসই রসবোধ এ বইয়ের বৈশিষ্ট। কাজটি করতে গিয়ে হকিং আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব  আর হাইজেনবার্গের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা - এই দুই মহাতত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছেন। আপেক্ষিক  তত্ত্বে আমরা স্থান-কাল-পাত্র ও মহাকর্ষ সহযোগে বৃহত্তর মহাবিশ্বের গঠন ব্যখ্যা করি। অন্যদিকে, কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় সাব-এটমিক পর্যায়ে কণাসমূহের আচরণ বুঝতে পারি। চূড়ান্ত বিচারে দুটি তত্ত্বই আলাদা, একেবারে ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’। একটা আরেকটার সঙ্গে যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও, বস্তু ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-এর নিউটনীয় মডেলের বাইরে একটি গ্রহণযোগ্য মডেল তৈরিতে আপেক্ষিক তত্ত্ব  আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সহায়ক হয়েছে। সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনায় হকিং একেবারে অসাধারণ।

যে বইয়ের বর্ণনার বিস্তৃতি বিগ ব্যং থেকে ব্ল্যাক হোল পর্যন্ত – এর বিক্রয় সাফল্যও চমকে দেওয়ার মতো। বইটি চার বছরেরও বেশি সময় ধরে লন্ডন টাইমস এর বেস্ট সেলারের তালিকায় থেকেছে। এটি অনূদিত হয়েছে ৬০ টি ভাষায় আর বিক্রি হয়েছে ২ কোটি। বিংশ শতাব্দীর একশটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের একটি অ্যা ব্রিফ হিষ্ট্রি অব টাইম দেড়শ বছর আগে ডারউইনের Origin of Species সমাজে যে সাড়া জাগিয়েছিল, অ্যা ব্রিফ হিষ্ট্রি অব টাইম ও অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করেছে আধুনিক মানুষের মনে। বইটির একাধিক ও বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।  স্টিভেন স্পিলবার্গ এই বই অবলম্বনে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে বইটির জনপ্রিয়তাকে আরেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন।

আলোচনা শেষে স্বপন বিশ্বাস শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এই পর্বে অংশ নেন আকবর হোসেন, মনিরুল ইসলাম, পালিওনতা পলাশ, চৌধুরী শামীম মাহমুদ, কাজী জহির উদ্দিন, সানন্দা চক্রবর্তী ও আলতাফ হোসেন। প্রশ্ন-উত্তরের এই পর্বটি ছিল বেশ আকর্ষনীয়। আসরটি মডারেট করেন ফারহানা আজিম শিউলী।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান