বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়'

Mon, Oct 23, 2017 11:52 AM

বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়'

শিতাংশু গুহ : ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্টতা পায় এবং সেই সংখ্যাগরিষ্ট বৈধতার জোরে আমরা স্বাধীনতা পাই। ঐ নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা একশ ভাগ ভোট দিয়েছিলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং তার দল আওয়ামী লীগকে। হিন্দুরা যদি সেদিন আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে ভোট না দিতো তাহলে কি আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্টতা পেতো? না পেলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হতো? এসব প্রশ্ন উঠছে, কারণ যাদের বিশাল আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা তারা আজ নিজদেশে পরবাসী? আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০লক্ষ মানুষ নিহত এবং ২লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারায়। সিনেটর রবার্ট কেনেডি রিপোর্ট বলছে, ভিকটিমদের আশি শতাংশ হিন্দু। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে যে, হিন্দুদের টার্গেট করা হয়েছিল। হিন্দু বাড়িগুলোতে 'এইচ' লিখে রাখা হতো। একটি দেশের স্বাধীনতার জন্যে যাদের এত আত্মত্যাগ, তারা এখনো প্রতিদিন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এ লেখাটি হিন্দু নির্যাতন নিয়ে নয়, বরং বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে। সমস্যা হলো, নির্বাচন নিয়ে লিখতে হলেও হিন্দু নির্যাতন এসে পরে, কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনের আগে-পরে সংখ্যালঘুরা অত্যাচারিত হয়েছে; কখনো কম, কখনো বেশি, এমনকি সর্বশেষ ২০১৪-র নির্বাচনের পরেও। স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দুদের অবদান ছিলো অপরিসীম, তাদের প্রয়োজন এবং ভূমিকাও ছিলো অপরিহার্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর অজ্ঞাত কারণে এই অপরিহার্যতার কোন গুরুত্ব থাকেনা। তাই এমনকি পাকিস্তানীদের ভেঙে দেয়া রমনা কালিবাড়িটি পর্যন্ত ফেরত দেয়া হয়নি। সেখানে গোড়াপত্তন হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের, যিনি কিনা বাঙ্গালীও নন? পাকিস্তান আমলের 'শত্রূ সম্পত্তি' কালো আইনটিও বাতিল হয়নি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলের কথা বাদ থাক, কারণ তখন তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত ছিলেন। তবে ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনটি ভালোই ছিলো। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সংবিধান কার্যকর হবার পর সেটা ছিলো স্বাধীন দেশে প্রথম নির্বাচন। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা তখনও আকাশচুম্বী। তারপর ১৯৭৫। বাকশাল। বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত। বাংলাদেশ আবার ব্যাকগিয়ারে চলতে শুরু করে।

এরপর ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচন। জাতি প্রথম দেখলো 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারি'। আরো দেখলো নির্বাচনের পরে সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার। এই নির্বাচনে হিন্দু ভোট বা কারো ভোটেরই গুরুত্ব ছিলোনা, কারণ ফলাফল আগেভাগে ঠিক ছিলো। প্রহসনের নির্বাচনের সেই শুরু? আজো তা চলছে। কেউ জানেনা কবে এর শেষ হবে? ১৯৮৬ ও ১৯৮৮-এর নির্বাচনের আগে-পরে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হয়েছে। ১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও হয়, এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন বাদ যায়না। মুখ্যত: যারা পরাজিত হয় তারা তাদের পরাজয়ের জন্যে সংখ্যালঘুদের দায়ী করে এবং হিন্দুদের বাড়ীঘর, ব্যবসা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়, নারীদের ধর্ষণ করে, কখনো কখনো হত্যা পর্যন্ত সংঘঠিত হয়। ধীরে ধীরে এটি একটি রেওয়াজে পরিণত হয়, নির্বাচন মানেই সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতন। নির্বাচন ও সংখ্যালঘু নির্যাতন শব্দ দু'টি একটি অপরটির জন্যে অপরিহার্য হয়ে যায়? ২০০১-র নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি-জামাত বিজয় উৎসব পালন করে ব্যাপক হিন্দু নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। এ যাবৎ নির্বাচনী সন্ত্রাসের মধ্যে ২০০১ এখনো শীর্ষে?

১৯৮১ সালে দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে বিচারপতি সাত্তার বিজয়ী হন। জিয়া হত্যার পর এই নির্বাচন ছিলো একটি প্রহসন, লোক দেখানো এবং সময় ক্ষেপন। নির্বাচনটি হয় ১৫ নভেম্বর ১৯৮১, এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন ২৪শে এপ্রিল ১৯৮২। এ প্রসঙ্গে প্রায়ত: সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একটি চমৎকার উক্তি আছে। বায়তুল মোকাররমে এক বক্তিতায় তিনি বলেন, দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলো, প্রতিদ্বন্ধিতা করলেন ডঃ কামাল হোসেন ও বিচারপতি আব্দুস সাত্তার; জনগণ ভোট দিলো ড: কামাল-কে, জিতলেন সাত্তার সাহেব এবং ক্ষমতায় বসলেন হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ'। সুরঞ্জিতদার এই বক্তব্য থেকে তখনকার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়! এটি আমি নিজকানে শুনেছি। বাংলাদেশে আরো দুইবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়, সেটা ১৯৭৮ ও ১৯৮৬। ঐসব নির্বাচনে জনগণের সম্পৃক্ততা ছিলো না, বরং তা ছিলো অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করার প্রক্রিয়া? একই লক্ষ্যে বাংলাদশে ১৯৭৭ ও ১৯৮৫-তে দুটি রেফারেন্ডাম হয়েছিলো, যা 'হ্যাঁ-না' ভোট নামে সমধিক পরিচিত। তবে ১৯৯১ সালের রেফারেন্ডামটি ছিলো ভিন্ন আঙ্গিকে।

১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়, বিএনপি নেয়না। প্রচার আছে যে, আওয়ামী লীগ তখন সরকারের সাথে আপোষ করেছিলো। আসলে তা নয়, বিএনপি চালাকি করে আওয়ামী লীগকে বোকা বানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে পড়ে। ঘটনাটি ছিলো এরকম: নির্বাচনে যাবে কি যাবেনা প্রশ্নে তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় জোটের মধ্যে অনেকগুলো মিটিং হয়। চূড়ান্ত মিটিং-এ গভীর রাতে যৌথ সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয় জোট নির্বাচনে অংশ নেবে এবং পরদিন তারা পৃথক পৃথকভাবে তা সাংবাদিকদের জানাবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আওয়ামী পরদিন সকালে জানিয়ে দেয় যে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। বিএনপি বিশ্বাসভঙ্গ করে। তারা প্রচার করে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছে। ঐ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সরকার গঠন করে, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে বসে। শেখ হাসিনা বিরোধী নেত্রী হিসাবে এই প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পান। ধারণা করি, ঐসময় তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন যে, দলকে ক্ষমতায় নিতেই হবে। সেই সুযোগ এসেছিলো ১৯৯১ সালে। অতিরিক্ত কনফিডেন্সের কারণে তখন আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। শেখ হাসিনা বিরোধী নেত্রী হন। খালেদা প্রধানমন্ত্রী। এরশাদ জেলে যান। শেখ হাসিনা তখন সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। যদিও তখন সেটি কেউ আমলে নেয়নি, প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগকে তখন জোর করে হারানো হয়েছিলো।

১৯৮৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বস্তুত এরশাদ একাই প্রার্থী ছিলেন, ক'জন নাম না জানা প্রার্থী ছাড়া। ১৯৯১ থেকে নির্বাচনের কথা মোটামুটিভাবে সবার মনে আছে। সেদিকে যাবার আগে ১৯৮৮ সালের সংসদ নির্বাচনের কথা কিছুটা বলা দরকার। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট বা বিএনপি জোট অংশ নেয়নি। জাতীয় পার্টি খালি মাঠে বিজয়ী হয়। আসম রব তখন 'গৃহপালিত' বিরোধী নেতা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন এবং মতিঝিলে জুতাপেটা হন। জোটের আন্দোলন তখন প্রতিদিন জোরদার হতে থাকে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামাত তখন পৃথক পৃথকভাবে একই কর্মসূচি পালন করে স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে। ১৯৭৫-এর পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মূলত: অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল এবং যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি চালু ছিলো। নির্বাচনের লক্ষ্যও ছিলো তাই? ঐসময় জেনারেলদের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে ধর্মভিত্তিক দল বিএনপি-জাপার জন্ম হয়, ক্যান্টনমেন্টে।

দেশে হিন্দুরা তখন রাজনৈতিক পুতুল, ভীত এবং নির্যাতিত। হিন্দুদের মধ্যে থেকে এই সময়ে একটি সুবিধাবাদী চক্রের সৃষ্টি হয়, সুনীল গুপ্ত, নিতাই রায় চৌধুরী, গয়েশ্বর রায়, মেজর (অব:)অনুকূল দেব প্রমুখ এরমধ্যে অন্যতম। পক্ষান্তরে হিন্দুদের অধিকার আদায়ে একই সময়ে সৃষ্টি হয় পূজা পরিষদ ও ঐক্য পরিষদের মত সংগঠন, যদিও এদের এখনকার ভুমিকা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এই সময় ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনায় বাংলাদেশে হিন্দুরা আবার অসহায় বোধ করে। দাঙ্গা বাঁধে এবং তাতে সরকারি ইন্দন টের পাওয়া যায়? ১৯৮৮ সালে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলে হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়? সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তখন প্রকাশ্যেই বলে যে, 'বাংলাদেশ ইসলামী দেশ, হিন্দুরা ভারত চলে যাও'। আবার ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে হিন্দুদের মনে কিছুটা আশার সৃষ্টি হয়। যদিও ১৯৯৬-র নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন করে বিএনপি-জামাত গোষ্ঠী। কারণ তারা জানে হিন্দুদের ভোটেই আওয়ামী লীগ জিতেছে। তাই হিন্দুদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে?

এটা সত্য যে, হিন্দুদের ভোট ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে কোন নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব ছিলোনা, কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনোই এটিকে সেভাবে মূল্যায়ন করেনি, তারা ধরেই নিয়েছে যে 'হিন্দুরা ভোটব্যাঙ্ক', ভোট না দিয়ে যাবে কোথায়? হয়তো এজন্যে, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬-২০০১ সময়ে শত্রূ সম্পত্তি আইনটি পর্যন্ত বাতিল করেনি। মেয়াদের একবারে শেষপাদে এসে জোড়াতালি দিয়ে একটি আইন করলেও, ২০০১-এ জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সেটি স্থগিত করে দেয়? বলা হয়ে থাকে যে, প্রথমদফা আওয়ামী সরকারটি ছিলো, কোয়ালিশন সরকার, তাই ইচ্ছে থাকলেও সরকার তেমন কিছু করতে পারেনি। সেটি সত্য নয়, এর প্রমান, ২০০৯-২০১৭ সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রবল পরাক্রমশালী, কিন্তু গুটিকয় চাকুরী দেয়া ছাড়া সরকার হিন্দুদের জন্যে কি করেছে? শত্রূ সম্পত্তি আইনের অবস্থাও তো 'ত্রিশংকু'। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, অর্পিত বা শত্রূ সম্পত্তি আইনে সরকার প্রায় ত্রিশ লক্ষ একর হিন্দু সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেছে, এরমধ্যে হিন্দুরা ফেরত পেয়েছে কতটা? স্পষ্টত: আওয়ামী লীগ এর ভোটব্যাঙ্ক-কে শুধু ক্ষমতায় যেতে ব্যবহার করেছে। এই সময়ে সংখ্যালঘুর ওপর যে তীব্র অত্যাচারের ঘটনাগুলো ঘটেছে এর একটিরও বিচার এই সরকার করেনি।

২০০১-র নিবাচনে বিএনপি-জামাত জোট জয়ী হয় এবং তারা বিজয় উৎসব পালন করে সংখ্যালঘু বিশেষত: হিন্দুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে। খুন, জখম, ধর্ষণ, বাড়ীঘর জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট, ব্যবসা তছনছ, চলেছে প্রকাশ্যে, সরকারি সহায়তায়। ঐসময় জনকণ্ঠ পত্রিকায় হেডিং ছিলো, 'একরাতে, একই স্থানে দুইশ' হিন্দু নারী ধর্ষিতা'; পূর্ণিমা, রিতা এদের প্রসঙ্গ নাইবা আনলাম। লন্ডনের ডেইলি মেল্ পত্রিকা হেডিং করেছিলো, 'মাইনোরিটিস আর সেফ অনলি ইন ডিপার্চার লাউঞ্জ'। বহু হিন্দু তখন দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। হিন্দুদের একমাত্র অপরাধ ছিলো, তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন। ২০০১-২০০৬ এসময়ে বিএনপি-জামাত শাসনামলে দেশে জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ বাড়লে স্বাভাবিকভাবে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বাড়ে, বাংলাদশে হচ্ছেটাও তাই। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ২০০১-এর সংখ্যালঘু নির্যাতনের তদন্ত করতে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশন প্রায় ত্রিশ হাজার ঘটনার উল্লেখ করলেও সুনির্দিষ্টভাবে পাঁচ হাজার নির্যাতন ঘটনার বিচার করার সুপারিশ করে। সরকার সেটি করেনি। সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার হয়নি। বাংলাদেশে হাজার হাজার মন্দির ও মুর্ক্তি ভাঙ্গলেও আজ পর্যন্ত একজন এই অপরাধে শাস্তি পায়নি? এটাই সত্য।

বাংলাদেশে ২০০৮-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনটি সম্ভবত: সবচেয়ে গ্রহণ যোগ্য নির্বাচন। এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন কম হয়েছে। হিন্দুরা আবার বিপুলভাবে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। তারপর ২০১৪-র ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন। ১৫৪জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। যাকিছু ভোট পড়েছে, দিয়েছে হিন্দুরা। পত্রিকায় শাঁখা-সিঁদুরের ছবি এসেছে, হিন্দু আবার নির্যাতিত হয়েছে। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, বিচার হয়নি। ২০০৯ থেকে দেশে নুতন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উন্নয়নের জোয়ার বইছে, সমানতালে চলছে সংখ্যালঘু নির্যাতন, দেশত্যাগ। রামুর ঘটনায় দেখা গেলো, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত সবাই মিলে বৌদ্ধদের মারছে। নন্দীরহাট, অভয়নগর, নাসিরনগর, লংদু, সাঁওতাল পট্টি সর্বত্র একই অবস্থা, হিন্দু নির্যাতনে নেতৃত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা এমনকি মন্ত্রীরা? আগে সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্যে বিএনপি-জামাত-মৌলবাদীরা দায়ী থাকলেও এখন সবাই, এবং আওয়ামী লীগও সমান বা বেশিরভাগ দায়ী? ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্যে দায়ী সরকার, কারণ সরকার একটি ঘটনারও বিচার করেনি। ফলে নির্যাতন চলছে তো চলছেই।

নির্বাচন এলে নির্যাতনের মাত্রাটা বেড়ে যায়। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুরা কম-বেশি নির্যাতিত হয়েছে। এই ধারা এখনো চলছে। সামনের নির্বাচনের আগে-পরে হবেনা এর গ্যারান্টি কোথায়? ১৫ই ফেব্রূয়ারি ১৯৯১ সালের নির্বাচনের কথা বলা হয়নি। ওটাও ছিলো প্রহসনের নির্বাচন। খালেদা জিয়ার ক্ষমতা ধরে রাখার অপপ্রয়াস। যদিও তার সেই আশা পূর্ণ হয়নি। ১২ই জুন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হন। খালেদা জিয়া যখনি ক্ষমতায় গেছেন, ক্ষমতা ছাড়তে চাননি, ক্ষমতায় থাকার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছেন। আওয়ামী লীগ প্রথম দফায় সুন্দরভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও ২০১৪-এ খালেদাকে অনুসরণ করেছে। খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের জন্যে যে গর্ত খুঁড়েছিলেন, এখন ম্যাডাম সেই গর্তেই পড়ে ফেঁসে গেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সামনের জাতীয় নির্বাচনটি কেমন হবে, কবে হবে, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কিনা, ইত্যাদি? সংখ্যালঘুরা ভাবছেন, তারা কি করবেন? বিএনপি-কে ভোট তারা দিতে চাইবেনা, অন্তত: ২০০১-এর নির্যাতনের জন্যে যতক্ষণ না ম্যাডাম জিয়া প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইবেন? আওয়ামী লীগের ৯ বছরের শাসনামলে সংখ্যালঘুর নির্যাতনের জন্যে অসন্তুষ্টি ব্যাপক। তৃতীয় কোন শক্তি নেই যে ভোট দেয়া যায়। এই শূন্যস্থান পূরণে ইতিমধ্যে কটি সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছে, যদিও এতে কাজ হবে বলে মনে হয়না?

তাহলে সংখ্যালঘুরা কি করবে? সংবিধান অনুযায়ী ২৮শে জানুয়ারি ২০১৯-এর মধ্যে একাদশ জাতীয় নির্বাচনটি হতে হবে। সেই হিসাবে ২০১৮ ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির প্রথমে নির্বাচন হবে। বাংলাদেশে এপর্যন্ত ১০টি সংসদীয় নির্বাচন, ৩টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ৩টি রেফারেন্ডাম হয়েছে। তাতেও কিন্তু গণতন্ত্র এখনো 'সোনার হরিণ'-ই রয়ে গেছে। নির্বাচন মানেই ঝামেলা, ভয়, শঙ্কা। শঙ্কাটা সংখ্যালঘুর মধ্যে বেশি। এতগুলো নির্বাচনের মধ্যে কয়টি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে তা বলা মুশকিল? দু:খজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এখনো একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। এজন্যে দায়ী সবাই। জিয়া বা এরশাদ অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তারা নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন সেটা বৃথাচিন্তা। কিন্তু দল হিসাবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এজন্যে বেশি দায়ী। তারা পারতেন একটি স্বাধীন-অবাধ নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। তারা তা করেননি, বরং ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্যে সচেষ্ট থেকেছেন। নির্বাচনের স্বচ্ছতা বা গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধতার কারণে গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে থেকে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সংখ্যালঘুরা। যেকোন দেশে গণতন্ত্রে সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে নিরাপদ থাকে।

যেহেতু গণতন্ত্র নাই, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাও কম। নির্বাচন মানে বিড়ম্বনা। ভোট দিলেও অপরাধ; না দিলেও অপরাধ। হুমকি-ধামকি, মারপিট তো আছেই। এমনও অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে যে, প্রার্থী ভোটের আগে এসে জিজ্ঞাসা করছেন, 'কাকে ভোট দেবেন'? হিন্দুরা বললো, আপনাকে। তিনি বললেন, ঠিক আছে, আপনাদের ভোট পেয়ে গেছি, নির্বাচন কেন্দ্রে যেতে হবেনা'। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা শিক্ষাদীক্ষা বা সচেতনতায় এগিয়ে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্র এদের এগিয়ে দিতে নারাজ। হয়তো এজন্যে কলামিষ্ট গাফফার চৌধুরী একবার বলেছিলেন, 'সেনাবাহিনীতে ৫% হিন্দু থাকলে বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান হতোনা'। কথাটা সত্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন নির্বাচনে এখন পর্যন্ত হিন্দুরা সমষ্টিগতভাবে, আওয়ামী লীগকে জয়ী করা ছাড়া আর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। ১০-১২% ভোট নিয়েও হিন্দুরা শুধুই মার্ খেয়েছে। ৩% ভোট নিয়ে জামাত এতদিন খেলেছে। ৭-৮% ভোট নিয়ে এরশাদ ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে চাইছেন। এবার খেলবে হেফাজত? সংখ্যালঘুরা কেন পারবে না? রাজনীতি হচ্ছে, 'গিভ এন্ড টেক। ভোট নিতে হলে কিছু দিতে হবে?

প্রশ্ন উঠেছে সংখ্যালঘুদের ৬০টি আসন ছেড়ে দিতে হবে? আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যদি এই দাবি মেনেও নেয়, তাহলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? এখনো তো সংসদে ১৫জন এমপি আছেন, তারা কি কোন কথা বলছেন? রামু, অভয়নগর, নাসিরনগর বা লংগদু নিয়ে কি তাদের কোন মাথাব্যথা আছে? সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে এদের মুখে কুলুপ আটা থাকলেও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এদের মুখে খই ফুটেছে। এর কারণ অন্যত্র এবং বহুবিধ। দেশে রাজনীতি থাকলে হয়তো দলীয় এমপি দিয়েও কিছু হতে পারতো, রাজনীতি নাই, তাই দলীয় এমপি বাড়লেও কিচ্ছু হবেনা। তবুও বাড়লে কোন ক্ষতি নেই? স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রশ্নই ওঠেনা, কারণ এদের মর্যাদা 'কয়েক সেট অলঙ্কারের মত হবে'। তাহলে সমাধান কি? আপাতত: কোন সমাধান নাই; তবে জোটবদ্ধভাবে সংখ্যালঘুরা কিছু সিদ্ধান্ত নিলে তাতে কিছুটা কাজ হতে পারে। ঐক্যবদ্ধ পৃথক রাজনৈতিক দল কিছুটা সুফল বয়ে আনতে পারে। নির্বাচন বয়কট একটি কৌশল হতে পারে। তবে যতদিন না 'ফ্রী ও ফেয়ার' নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন কিছুতেই কিছু হবেনা? কারণ ভোটেরই যদি কোন মূল্য না থাকে তাহলে হিন্দু ভোট দিয়ে কিহবে?

আগে ততটা না হলেও এক্ষণে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ২০১৪ সালের নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। বড়বড় দলগুলো তাদের দুয়ারে ধর্ণা দিচ্ছে। সংখ্যালঘুরা বাদ থাকবেন কেন? সমস্যা হলো, হিন্দুরা চায় অন্যরা তাদের কাজটি করে দিক? সেটি হবার নয়? সংখ্যালঘুরা হেফাজতের মত দেশদ্রোহী আন্দোলন করতে না পারলেও গান্ধীর মতাদর্শে অহিংস কর্মসূচি তো পালন করতে পারেন? অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের জেলগুলো ভরে দিলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। সমস্যা হলো, 'ঘন্টা বাধবে কে?' যারা গীতা পড়েন তারা বলেন, বারবার গীতা গীতা বলতে থাকলে তা আসলে 'ত্যাগ' হয়ে যায় বা শব্দটি 'ত্যাগ' শোনায়। আসলেই তাই, 'ত্যাগ চাই মার্সিয়া, ত্যাগ'।হিন্দুরা এই যে একতরফাভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়ে গেছেন, এর প্রতিদানে শুধুমাত্র কথার ফুলঝুরি ছাড়া আর কি পেয়েছেন? তাদের চাহিদা বেশি ছিলোনা, তারা চায়, নিজদেশে সবার সাথে মিলে সুখে-শান্তিতে থাকতে। তারা জানে, এরজন্যে দরকার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন। আওয়ামী লীগ অন্তত: মুখে এসব কথা বলতো, তাই তারা এই দলের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন দিয়ে গেছে। ২০১৭-তে দাঁড়িয়ে কি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মধ্যে খুব বেশি তফাৎ চোখে পড়ে?

আওয়ামী লীগ ১৯৭২-এর সংবিধান পুন্:প্রবর্তনের সুযোগ পেয়েছিলো, করেনি? কারণ দলটির চিন্তা-চেতনা এখন ১৯৪৮সালের মত। অনেকে এখন এটিকে 'হেফাজত আওয়ামী লীগ' বলে; এতটা নাহলেও এটি কি বর্তমানে 'মুসলিম আওয়ামী লীগ' নয়? বাংলাদেশে বামঘেঁষা দলগুলো ছাড়া ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা সবগুলো দলের চরিত্র এখন 'ইসলাম ঘেঁষা'। দেশকে যদি মৌলবাদী বানাতে সবাই উঠেপড়ে লাগে, তাতে সংখ্যালঘুরা থাকবে কেন? 'মিনি পাকিস্তান' বানানোর জন্যে তো দেশটা স্বাধীন হয়নি? অনেকে দু:খ করেন, বর্তমান মন্ত্রীসভায় একজন পূর্ণ হিন্দু মন্ত্রী পর্যন্ত নাই? প্রশ্ন হলো, থাকলে কি হতো? ১৯৭৫-এর পর যতজন হিন্দু মন্ত্রী হয়েছেন, তারা কেউ কি হিন্দুবান্ধব? নাকি তারা কখনো কথা বলেছেন? ব্যতিক্রম ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, তাকে 'কালো বিড়াল' বানিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন প্রধান বিচারপতি হয়েছেন, তিনি কোন অন্যায়ই করেননি, জাতির জনককেও অসম্মান করেননি, অথচ পুরো সরকার তার চৌদ্ধগুষ্ঠির বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন? বাবা বলতেন, শিশু যেই মাটিতে আছাড় খায়, সেই মাটি ধরেই উঠে দাঁড়ায়। হিন্দুদের বাংলাদেশের মাটি ধরেই উঠে দাঁড়াতে হবে। ঘুরে দাঁড়ালে নির্বাচনের সুফলও নিশ্চিত।

২১অক্টবর ২০১৭। নিউইয়র্ক।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান