বীথির কাছে চিঠি-৩৪

Mon, Oct 9, 2017 10:58 PM

বীথির কাছে চিঠি-৩৪

লুনা শিরীনবীথি, জীবনের অপর নাম দর্শন-- কথাটা কি তুই মানিস ? কয়কেদিন হোলো সরদার স্যার মাথার ভিতরে আসন গেড়েছে  বলেই বার বার ভাবছি জীবনের সথিক পথ কোনটা?  সত্যিকার উপকার আসলে কি দিয়ে হয় ?

অন্য দুটো প্রসঙ্গ বলি, মন দিয়ে কথা শুনবি কিন্তু বীথি । আমার অফিসেই এইবছর জানুয়ারী /ফেব্রুয়ারির দিকে এক নিউকামার  লোকের সাথে পরিচয় হলো, রিসিপশনস  ডেস্ক-এ কথা বলছিলো ,আমি লোকটাকে দেখে বলালাম ,বাংলাদেশ থেকে এসছেন ?  বলে না কলকাতা , আমি বলি , বাংলা বলতে পারেন ? বলে হ্যা হ্যা , বলেই শুরু হলো দিদি দিদি । আমার  চেয়ে বছর আটেক  ছোট তুষার দাশ , মাত্র তিন দিন আগে এসছে, ভীষন এক হতবিহবল  অবস্থায়  তুষার এর সাথে পরিচয়। আমাকে শুদু বল্লল – দিদি এই তিনদিনে একমাত্র আপনি –ই আমাকে আশার আলো দেখালেন, দুটো ভালো কথা কানাডা নিয়ে বললেন। আমি আজকেই যাচ্ছিলাম, কোলকাতার ফিরতি টিকেট কাটতে।  কিন্তু আপনাকে পেয়ে হয়তো আরো ১৫ দিন দেরী করবো ।আপনি বিশ্বাস করুন – আমার   মুখে আগুন দেয়ার আগ মুহুরত পর্যন্ত আপনাকে মনে রাখবো । এই হোলো তুষার , বীথি।

প্রথম দিন দেখার পরে আমার সাথে আর মাত্র একদিন দেখা হয়েছিলো, আর দেখা হয়নি, যোগাযোগ ফোনেই, আমার কথার উপর ভরসা রেখেই কলকাতা থেকে বঊ /বাচ্চাকে আনিয়েছে , কারন আমি জানি এই দেশে একা যুদ্ধ করার চেয়ে পরিবারের সাপোর্ট অনেক বেশী  কার্যকর।  তুষার এর বঊ মৌসুমি আর ৫ বছর এর মেয়ে কুড়ি আমাকে দেখার জন্য মুখিয়ে আছে।  কিন্তু আমি সময় করতে পারিনি। এদিকে তুষার এর সাথে কথা হলেই আমাকে বলতে থাকবে, দিদি আপনি মহান। আজকে আমি তুষারকে ধমকেছি অনেকক্ষণ এবং তারপর থেকেই ভাবছি আমি কি ঠিক বললাম ওকে ? সেই কথাটা বলার জন্যই আবার  তোর কাছে বসা।

 আমি কানাডাতে আসার পরে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপকার করেছিলো আমার ছোটোবোন কনা আর ওর স্বামী মঞ্জুর।  আমাকে ও বলেছিলো , মেঝপা তুমি এই দেশে পড়াশোনা  না করলে কিছুই করতে পারবে না, কিছুই না । হ্যা ওরা আমাকে প্রথম দু বছর মেন্টাল  এবং আর্থিক সাপোর্ট ও করেছিলো , কিন্তু সেই সময়  তো আমি প্রথম ২৫ দিনেই ম্যাক এর কাজ পেয়েছিলাম।  আজকে আমি জানি, ম্যাক এ যদি থেকে যেতাম তাহলে এখন যা বেতন পাই তাড় চেয়ে খুব আকাশ / পাতাল কম কিছু পেতাম না, কিন্তু  জব এ যে সন্মান বা জব স্যাটিস্ফেশন  সেটা  কি ম্যাক এ থাকতো আমার ?

বীথি আবার ও বলি তোকে অপশন নেই বলেই এই জীবন  বেছে  নিয়েছি আমি—এর চেয়ে ভয়াভয় জীবনযাপন কি আর কিছু হতে পারে ? আমি আজকে তুষার কে বললাম , কেন তুমি আমাকে প্রেইজ করো , তুমি কি মনে করো আমি বোকা ? কি করেছি তোমার জন্য আমি ? আমার প্রিয় জীবনযাপন থেকে কিছু জিনিস না হয় দিয়েছি আমি, কিন্তু আমি কি ক্যাশ ডলার দিয়েছি তোমাকে ? তুমি কি জানো ক্যাশ  ডলার যদি দিতাম তোমাকে আমি তাহলে আজকে তোমার সাথে আমার  সম্পর্ক থাকতো না, তুমি অপরাধ বোধে  ভুগতে আর আমি ভাবতাম , শালা, র নিঊকামার , আমার কাছে  অসহায় ভাব দেখালো আর আমি বোকার মতো ডলার দিলাম , তাই কিনা তুষার ? টাকা দিয়ে যে জীবনের কোন  সত্যিকার সমাধান হয় না সেটা আমি আমার ব্যাক্তিগত জীবন দিয়ে এমনভাবে , এত  কঠিন আর নির্মম ভাবে  শিখেছি যে এই সত্য আমার মন / শরীর আর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমি ভুলতে পারি না  সেই অমানবিক ঘটনা,এক মুহুরতের জন্য না ।

টাকা দিয়ে কি কাউকে সুখী করা যায় ? এটাও একটা প্রশ্ন আমার নিজের কাছে ? যে পরিবার ছেলে বা মেয়েকে অগাধ টাকা দিয়ে সেটেল করতে চায় তারা কি টাকা দিয়ে সুখী হয় শেষ অব্ধি নাকি নিজের  শক্তিতে দাড়াতে হয় ? যে গরীব বা মধ্যবিত্ত  মেয়েকে যৌতুক  দিয়ে , বা অনেক অনেক টাকা দিয়ে  বিয়ে দিয়ে বাবা মা ভাবেন তার মেয়ে সুখী হবে, তারা কি কোনদিন সেই মেয়ের মনে কান পেতে দেখেছে ? মেয়ের গোপন কান্না শুনছে কোনদিন ? যে স্ত্রী মনে করে আমার স্বামীকে এইটুকু হেল্প করলেই সে আমাকে ভালোবাসবে – সেই  স্ত্রী কি কোনদিন  নষ্ট স্বামীকে কোন শর্ত দিয়েই  তার দিকে বা সত্তিকার জীবনের দিকে ফেরাতে পেরেছে ? মানুষকে দাড়াতে হয় নিজের সাহস আর শক্তির উপরে , প্রথমে  সম্মান  করতে হয়  নিজেকে, ভালো ও বাসতে হয় নিজেকেই ।  সময় সময় ভাবি   বীথি – এই বিদেশ এ না আসলে বা জীবনকে এত সুন্য থেকে সুরু না করলে  বোধহয় এমন বোধহীন থেকে যেতাম আজন্ম – জীবনে যে কষ্ট আর দুঃখ গুলো পেয়েছি সেজন্য যে জীবনের কাছে আমি কত ঋনী জীবন কি তা জানে ? আবার ছুটি বীথী , অনেক আদর তোকে ।

১৯/ ০৬/২০১৪

আরো পড়ুন : বীথির কাছে চিঠি-৩৩


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান