কানাডায়ও চিকিৎসা বাণিজ্য!

Mon, Sep 11, 2017 6:32 PM

কানাডায়ও চিকিৎসা বাণিজ্য!

খুরশীদ শাম্মী:

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো চিকিৎসাও মানুষের একটি প্রধান মৌলিক অধিকার। বিশ্বের প্রায় সব দেশই চেষ্টা করে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে তার নাগরিকদের এই মৌলিক অধিকার পূরণ করে দেয়ার। এরপরও জনগণকে অত্যাধুনিক ও দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেয়ার উদ্দেশ্যে দেশে দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন আধুনিক হাসপাতাল গড়ে উঠছে। একই ধারায় বাংলাদেশে একদল চিকিৎসক তাদের ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবার নামে যে অনৈতিক বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন, এর কিছু ঘটনা শুনে থাকলেও নিজেকে এর মুখোমুখি হতে হয়নি ।ফলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়নি ততোটা। এমন কি কানাডার চিকিৎসা পদ্ধতির নানা প্রকার নেতিবাচক মন্তব্যকে উপেক্ষা করে একজন কৃতজ্ঞ নাগরিক হিসেবে সর্বদা চেষ্টা করেছি ইতিবাচক মন্তব্যকে ঘিরে থেকে সর্বাধিক সেবা গ্রহণের। কিন্তু সময় গড়িয়ে চলছে নিজের গতিতে। আর চলার পথে নানান বাস্তবতার সাথে লড়াই করতে গিয়ে ইদানিং প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগে মনে, চিকিৎসা কি এখনও সেবামূলক কোনো পেশা? না কী রূপান্তরিত হয়েছে অন্য কিছুতে? চিকিৎসকেরা পারছেন কি নিজেদের যোগ্যতার সম্মান ধরে রাখতে? 

বয়সের সাথে সাথে হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে যাতায়াত বেড়ে যাচ্ছে দিনদিন। কেবল যে শুধু নিজের জন্যই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয়, তা কিন্তু না। আজ নিজের সমস্যা, তো কাল কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা নিজ পরিবারের অন্য কারোর সমস্যার জন্য হলেও হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। অন্যের জন্য হাসপাতালে এই যাতায়াত কেবল প্রয়োজনের জন্যই নয়, সম্পর্কের মূল্যবোধ, অনুভূতি এবং কখনো সামাজিক দায়-দায়িত্ববোধ থেকে যেতে হয়। যতই বয়স বাড়ছে, নিজের প্রয়োজন ও দায়িত্ববোধ দু’টোই যেন বেড়ে চলছে।

যেহেতু ঘন ঘন যাওয়া হচ্ছে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে তাই বহুমুখী অভিজ্ঞতাও বাড়ছে। চিকিৎসক ও হাসপাতাল সম্পর্কে এতোদিনের ধারনা পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে খুব ভালো মনে হয়; আবার কখনো কখনো নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। আমার মতো মনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য অনেকেই হয়তো ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করবেন। কিন্তু অনেকগুলো অভিজ্ঞতাকে জড়ো করে দেখলে হতাশ হওয়ার ঘটনাই বেশী পাওয়া যায়। এই অভিজ্ঞতা আমার একার নয়। অনেকের সাথেই হয়তো মিলে যাবে।

কানাডায় সকল নাগরিক বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেয়ে থাকে। হয়তো প্রদেশভেদে চিকিৎসা সেবার মান ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা দেয়া হয় কানাডার প্রতিটি প্রদেশে। নিয়মানুযায়ী অন্টারিওর নাগরিকদের ছোট ও মাঝারী যে কোনো শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ে প্রথমে যেতে হয় তাদের পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে। পারিবারিক চিকিৎসক রোগীকে দেখে যদি মনে করেন যে রোগীর কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দরকার, তখনই কেবল তিনি তার রোগীকে একজন বিশেষজ্ঞর সাথে দেখা করার লিখিত অনুমতিপত্র দিয়ে থাকেন। আর যদি তিনি মনে করেন যে রোগীর শারীরিক সমস্যাটা খুব গাঢ় নয়, তখন তাকে দু’টো মৌখিক পরামর্শ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। আবার কখনো একটি প্রেসকিপশন ধরিয়ে দিয়ে বলেন, খুব বেশী প্রয়োজন হলেই যেন ঔষধ কিনে খাওয়া হয়; এবং এরপরও যদি ভালো অনুভব না হয় সেক্ষেত্রে রোগীকে আবার দেখা করার অনুরোধ করেন। দ্বিতীয়বার একই কারণে রোগী দেখা করতে এলে চিকিৎসক তাকে রক্ত পরীক্ষা কিংবা অন্য কোনো পরীক্ষার জন্য লিখিত ফরমাশ দেন এবং দুই-এক সপ্তাহ পর আবার দেখা করার অনুরোধ করেন। দেখা যায় রোগী তার একই শারীরিক কষ্টে বারবার ফিরে আসে তার পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, শত ব্যস্ততার মাঝে, কাজে ছুটি নিয়ে দুই-তিন ঘন্টার অধিক সময় অপেক্ষা করে চিকিৎসকের দেখা পেলেও অধিকাংশ পারিবারিক চিকিৎসকই রোগীদের কাছ থেকে একদিনে একাধিক শারীরিক সমস্যার কথা শুনতে চাননা। তারা বিনয়ের সাথে পরোক্ষভাবে অনুরোধ করেন অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে আবার দেখা করার জন্য। কেননা যতবার রোগী তার সাথে দেখা করবে, ততবারই রোগীর হেলথ কার্ড ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আদায় করা যাবে। তারা বুঝতে চান না যে, একজন রোগীর সমস্যা একাধিক হলেও শরীর কিন্তু তার একটাই! একাধিক সমস্যা মিলে একটি কঠিন রোগের কারণও হতে পারে। তারা রোগীর সেবা নয়, আসলে তাদের নিজেদের সেবায় ব্যস্ত থাকেন। এভাবে চিকিৎসকের প্রথম পর্যায়ের সৎ বাণিজ্যের শিকার হয়ে কখনো কখনো রোগীর মাঝারী আকারের সমস্যা বৃহৎ আকার ধারণ করে। তখন রোগীর বিশেষজ্ঞদের সাথে দেখা করার এপোয়েন্টমেন্ট পেতে লেগে যায় আরো কয়েক সপ্তাহ, এমন কি কয়েক মাস। এরপর যখন বিশেষজ্ঞদের দেখা মেলে, সেখানে ঘটে আর এক খেলা। প্রথমেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার অনুমানিত রোগের নাম বলে দিয়ে একের পর এক পরীক্ষা শুরু করেন, তবে পরীক্ষাগুলো করার জন্য নিজেদের নির্ধারিত ল্যাবে যাওয়ার পরামর্শ দেন, এমন কি নিজেরাই যোগাযোগ করিয়ে দেন। নানান পরীক্ষা করে রোগীর রোগ নির্ণয় করতে লেগে যায় কয়েক মাস, এমন কি বছরও। আবার কখনো রোগ নির্ণয় করতেই ব্যর্থ হন। আর এদিকে চিকিৎসকের অনুমানিত রোগের নাম শুনে রোগী বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল জানার আগেই কঠিন রোগের ভয়ে মানসিকভাবে আরো একধাপ অসুস্থ হয়ে পরেন। দীর্ঘ পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে রোগীর পরিবার বাধ্য হয় দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আশায় রোগীকে নিয়ে ভিন্ন দেশে অধিক অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালগুলোতে ছুটে যেতে। অথচ মাঝে মাঝে এমনও হয়, রোগীর ব্যক্তিগত হেলথ ইন্সুরেন্স না থাকায়, ওহিপ ব্যয় ভার বহন করবে না ভেবে কানাডার চিকিৎসকেরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কোনো একটি পর্ব হয়তো বাদ দিয়ে দেন, রোগীর কাছে জানতে চাওয়ারও প্রয়োজনবোধ করেন না যে চিকিৎসার ঐ পর্বের জন্য অর্থ ব্যয় করতে সে সক্ষম কি না? কষ্ট হয় ভাবতে উন্নত দেশে বসেও সরকার অনুমোদিত চিকিৎসা সেবা পেতে আমাদের মোকাবিলা করতে হয় এমন বিশৃঙ্খলা। আর দাঁতের চিকিৎসকদের কাছে একবার যেতে হলে তো আর কথাই নেই। একটি সমস্যা নিয়ে গেলেও সেখান থেকে বেড় হতে হয় একাধিক সমস্যা নিয়ে। আর যদি দন্তচিকিৎসক একবার জানতে পারেন যে রোগীর ইন্সুরেন্স করা আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত চিকিৎসা চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ইন্সুরেন্স ক্লেইম করা সম্ভব। 

কোনো কারণে হাসপাতালগুলোর জরুরী বিভাগে যেতে হলে, সেখানে মোটামুটি ৪ থেকে ৬ ঘন্টার একটা যাত্রা হয়। কখনো কখনো এই যাত্রা ১২ ঘন্টারও অধিক হয়ে যায়। তবুও এমার্জেন্সিতে গেলে একটা নিশ্চয়তা থাকে যে প্রয়োজনে সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখা ও তার পরামর্শ নেয়া সম্ভব হয়। তবে এমনও ঘটনা আছে যে রোগীকে কোনো বড় সমস্যা নেই বলে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল এবং সে রাতেই রোগী মারা গিয়েছে। এছাড়াও আজকাল কানাডাতেও ভুল চিকিৎসার ফলে মানুষের অনেক বড় ক্ষতির খবর শোনা যায়।

এ হচ্ছে কানাডার চিকিৎসকদের সহজ বাণিজ্য পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনেক চিকিৎসকই অনুসরণ করেন। তবে সংখ্যায় কম হলেও কিছু সৎ চিকিৎসক দেখা যায় যারা সত্যিই মানুষের সেবা করার চেষ্টা করেন। তাঁরা চিকিৎসাকে এখনও সেবামূলক পেশা হিসেবেই দেখেন। তাঁরা তাঁদের ছাত্রজীবনে লেখা “জীবনের লক্ষ্য” রচনায় উল্লেখিত উদ্দেশ্যকে সময়ের সাথে পাল্টে দেন নি। তাঁরা আমাদের কাছে সর্বদা সমাদৃত। আর যারা পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে ব্যবহার করে অধিক আয়ের লক্ষ্যে সেবামূলক পেশাটিকে বাণিজ্যে রূপান্তরিত করছেন, তাদের জন্য করুণা হয় এইভেবে যে তারা পড়াশোনা করে চিকিৎসক হয়েও হতে পারেননি একজন সম্মানিত চিকিৎসক! এরা যে কেবল কানাডায় আছেন, তা নয়। এরা আছেন আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রতিটি দেশে।

সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান