৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৫০ | সাপ্তাহিক  | ২৩ আগস্ট ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

আরশিতে দেখা কলমে লেখা

-সাজ্জাদ আলী

পন্ডিত-মূর্খ এক কাতারে

একঃ

টরন্টো’র ড্যানফোর্থে বাংলা কাগজের অফিস থেকে বেরুবো বলে দরজা খুলে পা বাড়িয়েছি। ঠিক একই সময়ে সেও ওখানে ঢুকছে। খানিকটা সাংঘর্ষিক অবস্থা। ভদ্রলোক সাদামাটা আঞ্চলিক ভাষার মানুষ, আমার দূরাগত চেনা। তবে জানা নেই মোটেই। কালেভদ্রে রাস্তাঘাটে দেখা হলে “কেমন আছেন, ভাল আছি” গোছের চেনাজানা। তার বা আমার কারুরই পরিচয়ের এই গন্ডি অতিক্রমের প্রয়োজন পড়েনি কখনও। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময়ের পরেই সে আমার হাতের চলতি সংখ্যার বাংলা কাগজটির দিকে ইঙ্গিত করে বললো, ওইডা পইড়ছেন? “না” সূচক মাথা নাড়লাম, মুখে বললাম এখনও পাতা উল্টাইনি। সে বললো, আইচ্ছা পড়েন তাইলে, রাইতে ফোন দিমুনে। গাড়ির দিকে এগুচ্ছি আর ভাবছি, ফোন দিবে কেন?

 

রাত সাড়ে আটটা কি ন’টা হবে, দিনের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছি। কর্কশ স্বরে ফোন বেজে উঠলো। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন ভূমিকা ছাড়াই বলে উঠলো, কাগজডা পইড়ছেন? আমি বললাম কি কাগজের কথা বলছেন, কে কথা বলছেন? দুপুরে দেখা ওইলো না আপনের লগে বাংলা কাগজে, পইড়ছেন কাগজডা? অপর প্রান্ত থেকে পুন:প্রশ্ন। বললাম, ওহো না তো এখনও পড়িনি। আইচ্ছা পড়েন তাইলে। এক ঘন্টা পরে আবার ফোন দিমুনে। বলেই ফোনটা রেখে দিলো।

 

মনে মনে ভাবলাম, বেশ তো আমার বাংলা কাগজ পড়া নিয়ে এ লোকতো দেখছি খুবই সিরিয়াস! কাজ-কর্ম পাশে সরিয়ে রেখে আগে খবরের কাগজের পাতা উল্টানো শুরু করলাম। তেমন বিশেষ কিছুই চোখে পড়লো না। বাংলা কাগজের অন্য আর দশটা সংখ্যার মতই প্রথম পাতা, শেষের পাতা, খেলার পাতা, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় খবরের পাতা, সব পাতায় ঠাসা বিজ্ঞাপণ, বিনোদনের পাতা, ইত্যাদি একে একে উল্টে গেলাম। পত্রিকার কোথাও এই ভদ্রলোকের সংশ্লিষ্ঠতার কিছুই চোখে পড়লো না।

 

ঘন্টাখানেক বাদে আবার তার ফোন। সেই একই জিজ্ঞাসা, কাগজ দেইখছেন? ব্যাপারটায় এবার আমি বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠলাম। আমাদের দুজনের সামান্য জানাশোনায় আজ পর্যন্ত কখনও ফোনালাপের দরকার পড়েনি। এ সপ্তাহের বাংলা কাগজে কি এমন ছাপা হয়েছে যে তাকে দুদুবার ফোন করতে হলো! বললাম, হা কাগজটা দেখেছি। কিন্তু কি ব্যাপার বলুন তো, এ সংখ্যায় কি তেমন ব্যতিক্রমি কিছু আছে যা আমার দেখা দরকার? বিশেষ কোন খবর বা অন্য কোন কিছু? সে বললো, ক্যান আপনের চোখে পড়ে নাই কিছু? বললাম, হ্যা অনেক কিছু দেখেছি বটে। কিন্তু আপনার আর আমার যৌথ আগ্রহের কোন বিষয়তো দেখলাম না। বললো, যে পাতায় লোকাল খবর ছাপা হয়, সেইডা ভাল কইরা দ্যাখছেন? আমতা আমতা করে বললাম, হা পাতা উল্টেছি বটে! বলুন দেখি কি আছে সেখানে? আরো একবার ভাল কইরা দেখেন, আমি পনের মিনিট পরে আবার ফোন কইরতাছি। বলেই ফোনটি রেখে দিলো।

 

এতো মহা যন্ত্রণা দেখছি! ওর এই ফোনাফুনিতে এবার আমি যথেষ্ট বিরক্ত! আমাদের দুজনের জানাশোনা এবং পূর্বযোগাযোগের গন্ডি অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ের। তো বাংলা কাগজে আজ এমন কি বিশ্বসংবাদ প্রকাশ হলো যে এই লোকের আমাকে সেটা পড়ানো চাইই চাই! মাথা পাগল কেছেমের লোক নাকি! যাহ্ ওর ফোন আর ধরবোই না! কিন্তু আমি ফোন না ধরলেও অপর পক্ষতো হাল ছাড়ছে না। প্রতি মিনিটে দুবার করে ফোন করেই চলেছে।

 

অগত্যা ফোন ধরতেই হলো। এ কোন অস্থির চিত্তের মানুষের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা! আমি হ্যালো বলার আগেই সে বললো, ঐ পাতাডা দেইখছেন? বিরক্তি চেপে বললাম, না দেখিনি। ভেবেছি যে আপনি ফোন করলে ঠিক কি দেখাতে চান সেটা জেনে নিয়ে একবারেই দেখবো। বলুন কোন পাতায়, কি দেখতে হবে? বললো, পঞ্চম পাতায় দেখেন আমার ছবি ছাপা হইছে। স্বগতোক্তি করলাম, ও আচ্ছা, এই তাহলে ঘটনা! তো পঞ্চম পৃষ্টায় পৌঁছানোর জন্য পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার কাছে জানতে চাইলাম, তা কি কারণে আপনার ছবি ছাপা হলো জনাব? আগে জান না পঞ্চম পাতায়, গ্যালেই দেইখতে পাইবেন!

 

পাঁচ পৃষ্টায় মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও কোথাও তার কোন ছবি দেখতে পেলাম না। বললাম, কই আপনার কোন ছবি তো দেখছি না। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে টেনে টেনে বললো, উপরের ডান দিকের গ্রুপ ছবিডার সামনের সারির অষ্টমজন আমি। দেখলাম, ৩০/৪০ জনের একটা গ্রুপ ছবি, সেটির নিচে ক্যাপশনে লেখা “কানাডা জাতীয়পার্টির নব গঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দ”। খুব পরখ করে দেখলে ছবিতে তার মুখের আদলটি আভা আভা বোঝা যায়। ভাগ্যিস সে বলে দিয়েছিলো যে ছবিটির বাঁ দিক থেকে অষ্টমজন সে, তাই শেষ রক্ষা হলো। বিরক্তি চেপে ভদ্রতা রক্ষা করে বললাম, বেশ হয়েছে ছবিটি!

 

ছবির প্রশংসা শুনে পুলকিত কন্ঠে সে বললো, কানাডা জাতীয়পার্টির দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পাইছি ভাই, দোয়া কইরবেন। ফোনের এ প্রান্তে আমি হাঁ হয়ে ভাবছি, ওর এত্ত বড় অর্জনে দোয়াতো করতেই হবে! কিন্তু সেতো দোয়া পড়ার সুযোগ দিলো না, ফোন রেখে দিলো! হয়তো তার মিশন ছিলো ওই ছাপানো ছবিটি দেখানো পর্যন্তই। কাজ শেষ, এবার ফোনের লাইনতো কাটবেই। আমি গন্ডমূর্খ মানুষ, এহেন ছবি ছাপানো নিয়ে তাঁর এতটা উচ্ছ্বোসিত হবার কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। উপরন্তু ভাবছিলাম কানাডা জাতীয়পার্টির কর্মকান্ডটা কি? এখানে তাদের দপ্তর কেন লাগে? আর দাপ্তরিক কাজকর্মই বা কি ধরণের? সব থেকে বড় যে প্রশ্নটি মনে আসছিলো তা হলো, সেই দপ্তরের সম্পাদকের কর্মযজ্ঞটাই বা কি? আহারে! আমাদের জনগণপতিরে বড়ই মায়া হলো তোমার জন্য!

 

দুইঃ

এর মাসদুয়েক বাদে ফেসবুকে দেখি জাতীয়পার্টির সেই নেতা আমাকে একটি ছবি ট্যাগ করেছে। এটিও একটি গ্রুপ ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল ১২/১৫ জনের একটি দলের মধ্যমনি হিসেবে কথিত ওই ব্যক্তি দুটো ফুলের তোড়া বাম পাশের বগলে বন্দি করে ডান হাতে আরেকজনের থেকে আরো একটি তোড়া গ্রহন করছে! ছবিটির ক্যাপশনে লেখা “কানাডা জাতীয় পার্টির নেতা বাংলাদেশের বিমানবন্দরে সম্বর্ধিত!” একবার ভাবলাম ছবিটিতে “লাইক” দিলে কেমন হয়! কিন্তু যেন দিব্যচোখে দেখতে পেলাম যে এই “লাইকটি” দেবার কারণে অন্তত ৫জন ঘনিষ্ট বন্ধু আমাকে ফেসবুক থেকে “আনফ্রেন্ড” করবে, আর আস্থা হারাবে শ’খানেক।

 

তিনঃ

কথিত জাতীয়পার্টির এই নেতা গেল সপ্তাহে বিনা এপয়েন্টমেন্টে অফিসে এসে হাজির। অপ্রত্যাশিত এই আগমনে আমি খানিকটা সংকিত হয়েছি বটে! তার নেতৃত্বের আবার নতুন কি বিচ্ছুরণ ঘটলো কে জানে! বসতে দিয়ে বললাম, বলুন জনাব আপনার কি খেদমত করতে পারি? হলুদ রংয়ের একখানা ইনভেলপ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, এই ছবিডা দয়া কইরা আপনার টিভিতে একটু দেখাইয়া দিয়েন। তার কথা শুনতে শুনতে ইনভেলপ খুলে দেখি, সে যে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে কানাডা জাতীয়পার্টির নেতা হিসেবে সম্বর্ধিত হয়েছিলো, সেই ছবিটিরই একখানা বড়সড় কপি। আমি একমনে ছবিটি দেখছি।

 

মানুষটি খানিকটা নত মস্তকে আমার সামনে বসে, চোখে মুখে মিনতি মাখানো অনুরোধ। বললো, আমার স্ত্রীর খুব হাউস ছবিটা যদি টেলিভিশনে দেখন যায়! তাঁর অসংগত প্রচারে আমাকে এভাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে বলে আমার খুব রাগ হলো। কিন্তু পর মুহুর্তেই মনে হলো আমার বন্ধু-স্বজনদের এ ধরণের নীতিহীন-প্রচার অনুরোধ তো ইতিপূর্বে আমি রক্ষা করেছি। তাহলে এই সহজ সরল মানুষটির উপরে আমি রাগছি কেন! বন্ধুদের ক্ষেত্রে আমার তো মনে হয়নি যে কাজটা মন্দ? এ কেমন দ্বিমূখী চরিত্র আমার? আরশিতে এবার যেন নিজের কালিমাখা মুখখানা ভেসে উঠলো। আমি বুঝতে পারি না এত কাঠখড় পুড়িয়েও মানুষ হিসেবে মাঝারী মানটাও কেন অর্জন করতে পারলাম না; উৎকৃষ্ট মানতো সুদুর পরাহত!

 

তিনঃ

আমরা এক মহা সংকটে নিপতিত! নেতার যন্ত্রনায় জনতা অতিষ্ঠ! লেখকদের প্রচার-তান্ডবে পাঠক পাঠে নিরাশক্ত! গায়কের আত্মপ্রচারের ধাক্কায় শ্রোতার কানে তুলো! এক মনোস্তাত্বিক বৈকল্যের মধ্যে পড়েছি আমরা! সমাজের কোন ব্যক্তিকেই আর বাতিঘর হিসেবে দেখতে পাই না। অনুসরণযোগ্য অভিভাবক নেই কোথাও! উচিৎ-অনুচিৎ, নীতি-নৈতিকতা, রুচিবোধ তবে কি উঠে যাবে সমাজ থেকে? অনুচিত কাজটি যখন “আমার করা দরকার”, তখন তার পক্ষে আমি দশটা যুক্তি দাঁড় করিয়ে ফেলবো? আমরা যেন কেউই কাউকে “না” বলতে পারছি না। একে অন্যের পিঠ চুলকিয়ে ঘা বানিয়ে ফেলছি!

 

এই নিবন্ধে কথিত জাতীয়পার্টি নেতার (!) না হয় পেটে বিদ্যা নেই, সে না হয় বুঝতেই পারে না যে তার প্রচারের প্রয়োজন রয়েছে কিনা, বা থাকলেও সে কাজটি কে করবে অথবা তা কিভাবে করবে। কিন্তু সুশিক্ষিতদেরওতো সেই একই দশা! এরাতো এদের জ্ঞানবুদ্ধি খাটিয়ে নানান মোড়কে ঐ জাতীয়পার্টির নেতার মতই আত্মপ্রচারের কাজটি করে চলেছেন। পার্থক্য হলো ওই নেতা (!) করছে না বুঝে, আর শিক্ষিতরা করছেন সজ্ঞানে, চতুরতার মোড়কে, প্রমিত উচ্চারণে! ওই মূর্খটাকে না হয় ক্ষমা করা চলে, কিন্তু এই পন্ডিতগুলোকে নিয়ে কি করি? 

এই যে আমাদের এত এত ডিগ্রী তবুও আমরা কেন এটুকু শিখতে পারলাম না যে, গায়কের কাজ গান করা, শ্রোতার কাজ সে গান শোনা (বা না শোনা), আর “গানের অ্যালবামের” প্রচারের কাজটি পরিবেশকের। পরিবেশক গান গেয়ে উঠলে যেমন উটকো শোনায়, ঠিক তেমনি শিল্পী নিজ গানের প্রচার-আয়োজন করলে সেটাও নিকৃষ্ট দেখায়। “কার কি কাজ” সেটা শিখবার একটা স্কুল থাকলে ভাল হতো। তবে অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হয় সে স্কুলটি ভাল চলতো না। কারণ ছাত্র কই, আর শিক্ষকই বা কোথায় পাওয়া যাবে?

 

পাদটিকাঃ

কালশ্রেষ্ঠ কন্ঠশিল্পী মান্নাদে’র কালজয়ী সেই গান “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই” আমাদের সকলেরই শোনা আছে। স্মৃতিচারণমূলক সেই গানটিতে গীতিকার মূলত: কফিহাউস আড্ডার সদস্য-বন্ধুদের চরিত্রগুলো বর্ণনা করেছিলেন। গানের কথার ছত্রে ছত্রে বন্ধুদের কান্ড-কীর্তি বর্ণিত হয়েছে। একটি স্তবকে গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার লিখেছিলেন,- “কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ, মুছে যাবে অমলের নামটা। একটা কবিতা তার হলোনা কোথাও ছাপা, পেলো না সে প্রতিভার দামটা”। তিনি আরো লিখেছেন,- “কাগজের রিপোর্টার মাইদুল এসে রোজ, কি লিখেছে তাই শুধু পড়তো”। এই গানটি যে কালজয় করতে পেরেছে এবং আজও প্রাসঙ্গিক, তার কারণ বোধ করি অমল-মাইদুলদের মত প্রচার-কাঙ্গালরা আজকের সমাজেও সদর্পে উপস্থিত!

(লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

 

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration