৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৫০ | সাপ্তাহিক  | ২৩ আগস্ট ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

বীথির কাছে চিঠি-৯

লুনা শিরীন

বীথি,

দিপীকা নামে আমার বছর কয়েক এর ছোট একটা মেয়ে,আমাকে বলে—জানেন,আমি একটা ব্যাবসা করি অন্যদেশে,অনলাইন ব্যবসা,আমার স্বামী সব জানে। আমার স্বামী মনে হয় এও জানে যে যে ছেলেটাকে আমি ভালওবাসি, কিন্তু কোনদিন আমার স্বামী আমাকে বলেনি তুমি এই ব্যবসা ছাড়ো, ডলার লাগবে না , আমাদের সুখ লাগবে। কেন বলেনি জানেন আপা—কারন আমার স্বামী জানে আমাদের এই কানাডা শহরে চলার জন্য যে মিনিমান খরচ লাগে  সেটার ব্যবস্থ্যা ও একা করতে পারবে না। এই বলে দীপিকা হেসে গড়িয়ে পরে,আর আমি মূর্খ /বোকা মেয়ের মতো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।

বীথি,এই ৪৫ বছর বয়সে আমি সত্যিকার  অর্থে বিশ্বাস  করি, জীবনে সত্যিকার   আন্তরিকতা,ভালোবাসা, টান – এইসব খোজার পুরো  চেষ্টাটাই একটা ভুল চিন্তা,আর যে চিন্তার সুত্রপাত ভুল সেটা কোনদিন বাস্তবতার আলো দেখবে সেটাও তো ভুল, তাই না বল ?

কিন্তু তারপরো আমি হলফ করে বলতে পারি পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ এই অসম্ভবকে ছোঁয়ার জন্যই প্রানপাত করে, কি নারী কি পুরুষ। সেদিন হুট করে মায়ের সাথে কথা বলছিলাম আমি, এক সময় মা অসামান্য সুন্দরী ছিলেন, যখন আমরা অনেক অনেক ছোট তখন দেখতাম আমার বাবার অনেক কলিগ / আমার মামাদের অনেক অনেক বন্ধু , বা দুরের কাছের অনেক অনেক পরিচিত মানুষ আমার মাকে ঘিরে থাকতো , মাত্র ২২ বছর বয়সে আমরা চারবোন জন্ম নিয়ে ফেলেছিলাম মায়ের গর্ভ থেকে, খুব টিপিকাল সৎ  ভালোমানুষ আমার  বাবা আমার মাকে কোনদিন প্রেমিক পুরুষ হিসেবে মন ভরিয়ে দিতে পারেন-নি, সে কথা সে-যুগে অনেক লক্ষ্য লক্ষ্য মা/  বাবার জন্যই সত্য। তাই বলে আমার মা যেমন বাবাকে ছেড়ে যাননি , তেমনি বাবাকেও মা ছেড়ে যাননি, কিন্তু তাই বলে কি মায়ের জীবন থেকে সব আবেগ/অনুভুতি চলে গেছে ? সেটা বললে কিন্তু ভুল বলা হবে, মিথ্যা বলা হবে।

আমার ব্যাক্তিগত জীবনে আমি যতবার সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে সবার  প্রশ্নের উত্তরকে ভয় না পেয়ে সঠিক ডিসিশন নিয়েছি ততবার সবার আগে আমাকে সবচেয়ে বড় সাপোর্ট করেছেন আমার মা। জানিস এ রকম মায়েয়া  বাংলাদেশের ঘরে ঘরে না  জন্মালে কোনদিন আজকের বাংলাদেশ একটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং অগ্রসরমান  মধ্যবিত্ত শ্রেণী পেতো না। কেন বলছি সেই কথাটা বলি  বীথি, আমাদের ঢাকার বাসায় অনেক বিখ্যাত মানুষের আসা/ যাওয়া আছে,আমার ছোটবোন শাহিনের কল্যানে, তুই তো জানিস, ,শাহিন ঢাকায় সাদাকালোর মতো এত বড় একটা  সফল ব্যবসা  প্রতিষ্টান চালায়,অনেক অনেক মানুষ পারিবারিক ভাবেই আমাদের বাসায় আসা যাওয়া করে। আর আরো অন্য একটা কারন ও এটার সাথে জড়িয়ে আছে, আমি তখন ক্লাস নাইন/টেনে পড়ি,সেইপ্রথম মেয়েদের স্কুল ছেড়ে কো এডুকেশন স্কুল এ যাই,ওই বাড়ন্ত বয়সে  ছেলে/ মেয়েদের প্রতি কি প্রবল একটা অনুভুতি কাজ করতো আমাদের,মনে পড়ে তোর  বীথি ? আমার মা সেই সময় আমাকে আর বড়পাকে একদিন ডেকে বললেন – রাস্তায় দাড়িয়ে ছেলে  বন্ধুদের সাথে কথা বলবে না,ওদের কে বাসায় আসতে বলবে,বাসায় বসে  গল্প করবে ,আড্ডা মারবে,ওই যে ওই বয়সেই আম্মা আমাদের জড়তা ভেঙ্গে  দিলেন, আর সেই চর্চা আমাদের এখন অব্ধি রয়ে গেছে, আমাদের চারবোনের এমন কোন বন্ধু /কলিগ বা জানা শোনা মানুষ নেই যে আমার মাকে ভালোবাসে না, বা আমার বাবা/মায়ের সাথে তাদের পরিচয় নেই।

ইউনিভারসিটি জীবনে আমার অনেক ছেলে বন্ধু আমার মায়ের কাছে  খাবার চেয়ে খেয়ে গেছে যা আমি জেনেছি অনেক পরে। মাত্র এইট-পাস আমার মা কি করে এতখানি আধুনিক হলেন সেই উত্তর আমাদের অনেকেরই জানা নেই রে। দ্যাখ বীথি , অনেক বয়স হয়ে যাচ্ছে তাই না,কথার খেই হারিয়ে ফেলি ইদানিং , চিঠি সুরু করেছিলাম আম্মার সাথে সেদিন কি কথা হলো সেটা বলবো বলে, আর সেই ফাকে তোকে কত কথা বলে ফেললাম। যাক, সেই যে   দীপিকার কথা বলছিলাম, আর বলছিলাম, আমাদের ঢাকার বাসার এক বিখ্যাত মানুষের আসা যাওয়া নিয়ে, তো এই দু-দিন আগে আম্মাকে ফোন করেছি দেখি  আম্মা  আবার ওই ভদ্রলোক এর কথা বলছেন, এক নামে যাকে ঢাকায় সবাই জানে ও চেনে। আমি বললাম, আম্মা , তুমি কোনদিন জানতে চাও না যে উনি বঊ নিয়ে আমাদের বাসায় আসে না কেন? আম্মা বলেন, ক্যামন করে আসবে লুনা, ও তো ওর বঊ এর সাথে  থাকেই না , ওরা তো আলাদা থাকে । তাহলে ওরা ডিভোর্স করে না কেন আম্মা ? ওনার বউকে তো আমি খুব ভালো করে জানি , উনি তো খুব করে একটা বাচ্চা নিতে চেয়েছিলো, অনেক আগেই ওনারা ফরমালি আলাদা হয়ে যেতো  তাহলে হয়তো দুইজনই ভালো থাকতো,যেখানে কোন  রিলেশন নেই সেখানে একসাথে থাকার মতো ভণ্ডামি দরকার কি আম্মা ?

এই প্রথম দেখলাম আম্মা ঠাণ্ডা মাথায় খুব নির্মোহ ভাবে বললেন, লুনা কয়টা মানুষ ভালো রিলেশন নিয়ে একসাথে থাকে ? তুমি কি জানো ৯০% মানুষ কোন উপায় নেই তাই সংসারে থাকে ? আমি চুপ করে থাকি, আমি জানি, আমার জীবন দিয়েই আমার মা জানেন যে এই উত্তর আমার পরিষ্কার জানা আছে , এই ভণ্ডামি আমি  করবো না বলেই একা হয়েছি জীবনে, এই কথা এখন আমার কাছের অনেকেই জানেন , কিন্তু এরপর? আমি আবার ও আম্মাকে প্রশ্ন করি – তুমি-ই বলো্তো আম্মা এইভাবে থাকা কি কোন ছেলে/ বা মেয়ের জন্যই  কাম্য ? নিশ্চয়ই না লুনা, কিন্তু সমাজ বদলাতেও তো সময় লাগে নাকি? আজকে আমাকে তুমি যে  প্রশ্ন করতে পারছো আমি কি তোমার নানীকে সেই প্রশ্ন করতে পেরেছিলাম,বলো ?

টরোন্টো শহরে এই মার্চেও শীত  ছেড়ে যাচ্ছে না বীথি ,ক্যামন দাঁতে কামড় দেয়া একটা শীত বাইরের   প্রকৃতিকে জড়িয়ে আছে সারাক্ষণ। জানালার সব পর্দা নামিয়ে দেই আমি, আমার সন্তান  মধ্য দুপুরে ঘুমিয়ে আছে , মানুষে মানুষের জটিল সম্পর্কের জাল, প্রবাহিত জীবন, জীবনের নানান  খানা-খন্দ আমাকে বিচলিত করে এই ছুটির দিনগুলো,শান্ত নীরব ঘরে আমি প্রচণ্ড আবেগ / আর ভালোবাসার তীব্রতা নিয়ে  অপেক্ষা করি, ভাবি  বরফ- তো গলবেই একদিন, মানুষও  ছুটে চলবে  স্বার্থহীন ভালোবাসার দিকে,আগামী পৃথিবী নিশ্চয়ই আরো কল্যান-কর  সম্পর্কের  সুচনা করবে—করতেই হবে , নইলে উপায় কি বল বীথী ?

আদর তোকে

– ১ লা মার্চ , ২০১৪

 

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration